অন্যের সমালোচনা কীভাবে বন্ধ করবেন?

অন্যরা আমাকে নিয়ে কী ভাবছে তা কীভাবে বন্ধ করবো?

অন্যরা আপনাকে নিয়ে কী ভাববে তা আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না তবে কীভাবে সেটার প্রতি প্রতিক্রিয়া জানাবেন তা আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। অন্যের সমালোচনা বা নেতিবাচক চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারলে আত্মবিশ্বাসের সাথে সামনে এগিয়ে যাওয়া সহজ হয়।

মানুষেরা অন্যের জীবনে অন্তর্ভুক্ত হতে পছন্দ করে। তারা নিজেদের মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে অন্যদের যাচাই করে, মন্তব্য করে।

তাদের থামানো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আপনি কীভাবে সেটার প্রতি প্রতিক্রিয়া জানাবেন তা পুরোপুরি আপনার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সমাজে কিছু লোক আছে যারা সবসময় আমাদের করা সবকিছুর ব্যাপারে মন্তব্য করে, তা আমরা ভালো কাজ করি অথবা খারাপ।

আরও পড়ুনঃ জীবনকে সহজ করার উপায় : এই ১০ টি অভ্যাস গড়ে তুলুন!

এই মন্তব্যগুলো অনেক সময় আক্রমনাত্মক হতে পারে। আপনাকে এটা মেনে নিতে হবে যে অসন্তোষজনক ফিডব্যাক যেকোন সময়, যেকোনো জায়গায়, যেকারোর থেকে আসতে পারে।

সেটার উপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা শুধু নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি আর এসব মন্তব্যের সাথে মানিয়ে নিতে পারি।

তাহলে অন্যরা আমার ব্যাপারে কী ভাবছে তার পরোয়া করা কীভাবে বন্ধ করতে পারি? অন্যের মতামতের ব্যাপারে ভাবা বন্ধ করে নিজের উপর ফোকাস করার কিছু পদ্ধতি নিচে উল্লেখ করা হলো:

১) জেনে রাখুন যে মানুষের স্বভাবই এরকম-

অন্যরা পদেপদে আপনার সমালোচনা করবে, সেটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি এবং আপনাকে এটা মেনে নিতে হবে।

মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শক এবং “এভোব দ্যা লাইন: লিভিং এন্ড লিডিং উইথ হিট” এর সহকারী  লেখক, ড. ম্যারা কেলমিচের মতে

“মানুষ অনুমোদন সন্ধানী কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত হবার মাধ্যমে খেসারত করে।”

মানুষ হিসেবে, আমরা সবাই একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে আছি, যা কিনা স্বাভাবিক। ফলস্বরূপ, প্রত্যাখ্যান ঘটতেই পারে, যার থেকে সৃষ্টি হতে পারে কোনো কিছুকে হারিয়ে ফেলার ভয়।

সবকিছুকে আমরা চাইলেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না।

২) নিজের ভয়কে জানুন-

অন্যের মন্তব্যকে ভয় পাওয়ার কারণে আপনি হয়তো নিজের সেরাটা দিতে পারছেন না।

এমন একটা সময়ের কথা চিন্তা করুন যখন আপনি খুব নার্ভাস ছিলেন, যেমন জনসম্মুখে বক্তৃতা দেবার আগের মুহুর্ত, বিশাল কনফারেন্সে হাত তোলার আগে, অথবা অপরিচিত মানুষ ভর্তি কোনো ঘর দিয়ে যাবার সময়।

আপনি সবার দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়াকে ভয় পাচ্ছিলেন, যার ফলে আপনার নিজেকে খুব ছোট, ভীত ও আঁটোসাটো মনে হচ্ছিলো।

কোনো ভুল করলে অন্যরা আপনাকে নিয়ে কী ভাববে সেটা ভেবে ভয় পেতে থাকলে, আপনি একসময় ঝুঁকি নেওয়া ছেড়ে দিবেন।

আপনি বিদ্রুপ বা প্রত্যাখানের স্বীকার হতে ভয় পাবেন। ফলে নিজেকে গুটিতে ফেলতে শুরু করবেন। তাহলে এসব পরিস্থিতিতে কী করা যায়?

  • নিজের পটেনশিয়ালকে অন্বেষণ করতে থাকুন এবং কোন জিনিসটা আপনাকে ইউনিক বানায় তার প্রতি মনোযোগ দিন।
  • নিজের প্রতিভা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে জানুন। আত্মমর্যাদা নিয়ে কাজ করুন।
  • যাদের উচ্চ আত্মমর্যাদা থাকে তারা অন্যদের মন্তব্যের পরোয়া করে না কারণ তাদের নিজের উপর আত্মবিশ্বাস থাকে।

৩) ভালো বন্ধুর সংখ্যা বাড়ান-

আপনার মন-মানসিকতা আপনার আশেপাশের মানুষ দ্বারা প্রভাবিত হবে।

আপনি কাদের সাথে আড্ডা দেন? তারা কি আপনাকে বিচার করে? আপনাকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে?

তাহলে সেইসব টক্সিক ও নেতিবাচক মানুষদের নিজের জীবন থেকে একেবারে ঝেড়ে ফেলুন বা আলাদা করে দিন।

একইসাথে যারা সবসময় আপনাকে সাপোর্ট করে তাদের সংখ্যা বাড়িয়ে দিন।

অনেক মানুষের বাড়িতে বা বন্ধু সার্কেলে সমর্থন দেওয়ার মতো লোকে থাকে না। তাহলে কী করবেন? নিজেই নিজেকে আগে সমর্থন করতে শিখুন।

৪) আত্মবিশ্বাস হচ্ছে মূল চাবিকাঠি-

এমন অনেকেই আছে যারা জনাকীর্ণ স্থানে যেতে ভয় পায়, ক্যাফে বা রেস্তোরায় একলা খেতে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

এমনকি এমন অনেক লোকও আছে যারা নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নরমাল একটা স্ট্যাটাস দেওয়ার আগেও দশবার ভাবে।

তারা ভয় পায় যে মানুষ তাদের অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখবে। কিন্তু কীভাবে এটাকে থামাবেন? সব আগে আপনাকে এটা মেনে নিতে হবে যে বাকি বিশ্ব আপনার পিছে লেগে নেই।

কিন্তু হ্যাঁ, কিছু লোক হয়তো আছে যারা সেই মুহুর্তে আপনার পোশাক বা কাজ দ্বারা আপনাকে বিচার করবে। কিন্তু তারপর কী?

আপনি কি করছেন তা নিয়ে সবসময় তারা ভাববে না। দিনের শেষে তারা আপনাকে হয়তো ভুলেও যাবে। তাদেরও নিজস্ব একটা জীবন আছে।

যদি কেউ নিজের দিনরাত অন্যের ব্যাপারে ভেবে কাটিয়ে দায় তাহলে হয়তো তার চিকিৎসা নেওয়া উচিত। বেশিরভাগ মানুষ আপনার প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপও করবে না।

তারা আপনাকে আর দশটা মানুষের মতোই দেখবে যে নিজের জীবন যাপনের চেষ্টা করছে এবং তারপর তারা নিজেদের কাজে চলে যাবে।

তাই এখন থেকে যাই করুন না কেন আত্মবিশ্বাস নিয়ে করুন৷ যদি আপনার মনে হয় যে সেটা একটা ভালো কাজ এবং সেটা কারো ক্ষতি করবে না তাহলে করে ফেলুন সেটা।

আপনি অবশ্যই পারবেন। নিজের উপর আত্মবিশ্বাস রাখুন যাতে নেতিবাচক মন্তব্য আপনাকে আঘাত করতে না পারে।

৫) নিজের উপর গর্ব করুন-

কেউ যদি আপনার কাছে এসে বলে যে আপনি মোটা, কুৎসিত, দেখতে ভালো না বা অন্য কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করে, তাহলে আপনি হয়তো কিছু সময়ের জন্য আপনার মন খারাপ হবে।

কিন্তু সেটাকে নিজের মাথায় চেপে বসতে দিবেন না এবং ভুলেও তাদের কথায় কষ্ট পাবেন না। ভাবার চেষ্টা করুন যে এসব নেতিবাচক মন্তব্যের পরোয়া আপনি করেন না।

যে এসব মন্তব্য আপনার কাছে মূল্যহীন। তাই সেগুলোকে হেসে উড়িয়ে দিন। সেগুলো আপনার কোনো উপকারে আসবে না। তারা আপনাকে কুৎসিত বললেই আপনি কুৎসিত হয়ে যাবেন না।

আমরা সবাই নিজ নিজ দিক দিয়ে সুন্দর। নিজের ভ্যালু গুলোর ব্যাপারে ভাবুন, দেখবেন আপনি তাদের চেয়ে অনেক বেশি স্মার্ট বা অনেক বেশি ম্যাচিউর।

আপনার ভ্যালুর ব্যাপারে আপনি ছাড়া কেউই পুরোপুরি জানবে না। 

আপনাকে নিজের মূল্য জানতে হবে, এবং সেটাকে প্রমাণ করে দিতে হবে। ঘৃণা-উদ্রেককারী বা নেতিবাচক মন্তব্য ইগ্নোর করুন কারণ তারা আপনাকে হিংসা করে বলেই সেসব বলে বেড়ায়।

৬) নিজের শক্তিমত্তা ও দক্ষতাকে জানুন-

নিজের শক্তিমত্তার ব্যাপারে জানা থাকলে আপনার দিকে নিক্ষেপ করা যেকোনো বাজে মন্তব্যই আপনি এড়াতে পারবেন।

ডায়েরি বা জার্নালের মতো করে নিজের শক্তিশালী দিক গুলোর একটা তালিকা প্রস্তুত করুন। তারপর সেগুলোকে বার বার নিজেকে পড়ে শোনান৷

সেই তালিকাকে নিজের মন্ত্রে পরিণত করুন যেটা আপনাকে মনে করাবে যে আপনি মূল্যবান। যখনই কারো মন্তব্য আপনার মনে আঘাত দিবে তখনই এটা করবেন।

কথা দিচ্ছি একসময় নিজের অনুভূতি গুলোকে সামলাতে আপনি সক্ষম হবেন। আপনি আর অন্যের বাজে মন্তব্যের পরোয়া করবেন না কারণ আপনার মাঝে একটা নেতিবাচক মাইন্ডসেট গড়ে উঠবে।

“যেদিন আপনি পরোয়া করা বন্ধ করবেন, সেদিন থেকে আপনি বাঁচা শুরু করবেন।

 — হ্যারি স্টাইল

৭) নিজের আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি করুন-

নিজের চিন্তা-ভাবনার ব্যাপারে অবগত থাকাটা জরুরী। কারণ সেটা আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করবে।

যেমন ধরুন, আপনি একজন ভালো উপস্থাপক। সেক্ষেত্রে, আপনাকে নিজের সক্ষমতা ও সম্ভাবনার উপর আস্থা রাখতে হবে।

যখন আপনার মন খারাপ হবে সেই লেখাগুলো পড়া শুরু করবেন। এসব শক্তিশালী শব্দ আপনাকে নিজের গুণ ও শক্তির উপর আস্থা এনে দিবে।

আমরা কে তার ব্যাপারে আমাদের সবারই একটা ধারণা আছে এবং সেটাই যথেষ্ট।

সেটা দিয়েই আমরা কাজ নিতে পারি। কিন্তু যদি আপনি অন্যের মতামতের পরোয়া না করে নিজের সেরাটা দিতে চান, তাহলে আপনাকে নিজের ব্যাপারে আরো শক্তিশালী সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

৮) সবাইকে খুশি করতে যাবেন না-

সবার মন রাখাটা সম্ভব না। সবসময় এমন কিছু লোক থাকবে যারা আমাদের বিচার করবে, তা আমরা যাই বলি না কেন বা তাদের সাথে যেমনই আচরণ করি না কেন।

যাই আসে না আপনি জিমে থাকেন, অফিসে বা ট্রেনে কিংবা কোনো অনলাইন গেমে। এমুহূর্তেই এটা ঘটে চলেছে।

আরও পড়ুনঃ জীবনে সফলতা অর্জনের ৭ টি উপায়

আপনাকে বিচার করা থেকে আপনি অন্যদের আটকাতে পারবেন না কিন্তু সেগুলোকে আপনার জীবনে প্রভাব ফেলা থেকে আপনি আটকাতে পারবেন।

সবাইকে খুশি করাটা অসম্ভব। তাই সেটা করতে গিয়ে নিজেকে নিঃশ্বেস করে ফেলবেন না। নিজেকে খুশি করুন তাহলেই হবে। সবাই আপনাকে পছন্দ করবে না এবং সেটা ঠিক আছে।

৯) যেমন কর্ম করবেন তেমনই ফল পাবেন-

আপনি যেমন কাজ করবেন জীবনে তেমনই ফল পাবেন। অন্যরা আপনাকে নিয়ে কি ভাবছে তা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে গেলে আপনি দিন শেষে নিজেরই ক্ষতি করে বসবেন।

যদি অন্যের মন জয় করার উদ্দেশ্য তাদের তোষামোদ করা শুরু করে দেন তাহলে সেটা পরিশেষে আপনার জন্য ভালো হবে না।

বেশিরভাগ মানুষই তোষামোদকারীদের পছন্দ করে না এবং তাদের প্রতি বিরক্তই হয়।

সবাইকে খুশি করার প্রচেষ্টায় আপনি নিজের আত্মমর্যাদা হারিয়ে ফেলবেন। যা কিনা আপনার জন্য ভয়ংকর হতে পারে।

১০) আপনার জীবনের জন্য আপনি নিজেই দায়ী-

কিছু মানুষ আপনাকে অপছন্দ করবেই, আপনি সে ব্যাপারে কিছুই করতে পারবেন না। অন্যদের খুশি করার চেষ্টা না করে নিজেকে খুশি করুন।

আপনার জীবনের জন্য আপনিই পুরোপুরি দায়ী৷ তাই নিচের প্রশ্ন গুলোকে এখনই আপনার মন থেকে সরিয়ে ফেলুন-

  • লোকে কী ভাববে?
  • আমার সম্মানের কী হবে?
  • লোকে এটা পছন্দ করবে তো?
  • এটা কি করা উচিত হবে?

জীবনে সবসময় আত্মবিশ্বাস রাখবেন এবং অন্যদের মতামত নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে যাবেন না।

শেষ কথা-

অন্যের মতামতের ব্যাপারে চিন্তা করতে থাকলে জীবনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। আপনার ভালোমন্দের ও সুখের জন্য একমাত্র আপনিই দায়ী।

অন্যের মন্তব্যকে আপনার সাফল্যের পথে বাঁধা হয়ে উঠতে দিবেন না। অন্যের নেতিবাচক মন্তব্যকে নিজের জীবনে স্থান দিলে তারা জিতে যাবে।

অন্যের সমর্থন না খুঁজে নিজের আত্মতুষ্টির উপর মনোযোগ দিন তাহলেই জীবনে সুখী হতে পারবেন।

“Youth Rider” কে সাপোর্ট করার জন্য ধন্যবাদ।

নিচে কমেন্ট করে জানিয়ে দিন কীভাবে আপনি নেতিবাচক মন্তব্যের পরোয়া করেন না। আমরা আপনার মূল্যবান মতামতের অপেক্ষায় থাকলাম।

Md. Tota Miahhttps://totamiah.com
লেখক বর্তমানে রাজশাহীর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত আছেন। এছাড়া তিনি একজন গবেষক, ব্লগার, ফিটনেস, উচ্চতর পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রে কাজ করেন। মোঃ তোতা মিয়া দেশের যুবসমাজকে কর্ম উপযোগী করে তোলার সপ্ন দেখেন।

JUST ADDED

More From The Author!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!