কীভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়ানো যাই?

আত্মনিয়ন্ত্রণ কি?

আত্মনিয়ন্ত্রণ হচ্ছে একটি মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতা। এটা হচ্ছে নিজের প্রতিক্রিয়া সামলানো ও পরিবর্তন করার ক্ষমতা যা বাজে অভ্যাস বর্জন করতে ও ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে আত্মনিয়ন্ত্রণ একজন ব্যক্তির স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো।

শুধু ইচ্ছে থাকাটাই যথেষ্ট না নিজের সিডিউল ঠিকমত মেইন্টেন করার জন্য অনেক প্রচেষ্টাও করা লাগে। পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করাতে ব্যর্থ হবার জন্য মানবজাতি বিশেষভাবে কুখ্যাত। আমরা পরিবর্তন পছন্দ করি না।

আরও পড়ুনঃ অন্যের সমালোচনা কীভাবে বন্ধ করবেন?

নতুন কিছুতে অ্যাডাপ্ট করতে আমরা দ্বিধাবোধ করি। পরিবর্তনকে এড়িয়ে যাবার প্রবণতা আছে আমাদের মাঝে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা ওজন কমাতে চাই, কিন্তু আমরা খেতে অনেক পছন্দ করি।

আত্মনিয়ন্ত্রণ কিভাবে অর্জন করা সম্ভব?

সৌভাগ্যবশত, নিচে উল্লেখিত কৌশল গুলো হয়তো আপনাকে আকাঙ্ক্ষা ও প্রলোভন জয় করতে সাহায্য করবে। ভালো অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য লাগে শৃঙ্খলা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ।

কিন্তু ভালো অভ্যাস গড়া ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়ানো বলার চেয়ে করা অনেক কঠিন এবং নিজেকে ইম্প্রুভ করার জন্য শারীরিক ও মানসিক শৃঙ্খলার দরকার হয়।

নিচে ৯ টা পদ্ধতি দেওয়া হলো যা আপনাকে ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতে ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়াতে সাহায্য করবে-

১) পরিকল্পনা করুন

কোন ধরণের পরিস্থিতিতে আপনি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন তা ভেবে দেখুন। প্রলোভন এড়ানোর জন্য আপনি কোন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন তা ঠিক করুন।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, যেসকল পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, সেসব পরিস্থিতিতে পূর্ব পরিকল্পনা থাকলে ব্যক্তি তার ইচ্ছেশক্তি বাড়াতে পারে।

যেমন, আপনি বিকেলে ভাজাপোড়া খাবার অভ্যাস ত্যাগ করতে চান কিন্তু সে সময়টাতে আপনার খুব খিদে লাগে বলে ভাজাপোড়া খেয়ে ফেলেন।

এখন যদি আপনি আগে থেকে পরিকল্পনা করে দুপুরে যথেষ্ট পরিমানে প্রোটিন, ফাইবার, কার্ব যুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার খান তাহলে আপনার পেট ভরে থাকবে।

ফলস্বরূপ আপনি বিকেলে ভাজাপোড়া এড়াতে পারবেন। আর একই সাথে হাতের কাছে কিছু স্বাস্থ্যকর খাবার যেমন ডিম বা ফল রাখতে পারেন। ফলে খিদে লাগলেও ভাজাপোড়ার বদলে সেগুলো খেতে পারবেন।

২) মেডিটেশন

আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর অন্যতম ভালো এক উপায় হচ্ছে মেডিটেশন। অনেক অভ্যাস আছে যেগুলো ক্ষতিকর জেনেও আমরা সহজে ত্যাগ করতে পারি না।

এর কারণ যথেষ্ট ইচ্ছাশক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব। মেডিটেশনের ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায় এবং বাজে অভ্যাসগুলো সহজেই ত্যাগ করা সম্ভব হয়।

যদি আগে থেকে মেডিটেশন করার অভ্যেস না থাকে, তাহলে মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন দিয়ে শুরু করতে পারেন। সেটা আপনাকে আত্মসচেতন হতে শেখাবে যাতে আপনি সফলতার সাথে প্রলোভন এড়াতে পারেন।

এই কৌশল আপনাকে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করবে যা আপনাকে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ এনে দিবে। মেডিটেশন আপনার মনকে একাগ্র হতে সাহায্য করবে।

নিজের আনন্দ, দুঃখ, রাগসহ সকল আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখবে। নিয়মিত মেডিটেশন করলে আপনার মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটবে।

৩) লক্ষ্য ঠিক করা

জীবনে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকাটা খুবই জরুরি। আমাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আমাদের নেওয়া প্রত্যেকটা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। লক্ষ্য যত সুনির্দিষ্ট হবে, সেটা অর্জন করার সম্ভাবনাও ততই বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু কোনো অবাস্তব লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব না।

তাই নিজের সাধ্যের মাঝে থেকে বাস্তবিক লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। যদি আপনার নিয়মিত ব্যায়াম করার অভ্যাস না থাকে তাহলে শুরুতেই রোজ ২ ঘন্টা করে ব্যায়াম করার টার্গেট সেট করে ফেলেন আপনি হয়তো ব্যর্থই হবেন।

ছোট ছোট পদক্ষেপ নিন, ছোট ছোট টার্গেট সেট করুন। সব আগে আপনাকে ব্যায়াম করার হ্যাবিট গড়ে তুলতে হবে। ৫ মিনিট বা ১০ মিনিট, সময়টা যতই অল্প হোক না কেন রোজ ব্যায়াম করুন। এরপর যখন ব্যায়াম করার অভ্যেস হড়ে উঠবে, তারপর কিছুটা করে সময় বাড়াতে পারবেন।

৪) প্রলোভন এড়ানো

যখনই আমরা কোনো লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগুতে থাকি আমাদের সামনে নানা ধরনের প্রলোভন আসতে থাকে, যা আমাদের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বাঁধার সৃষ্টি করে।

প্রলোভন এড়ানোর জন্য আপনাকে সব আগে সেসব পরিস্থিতির ব্যাপারে ভাবতে হবে যেগুলোতে কোনো বাজে আকাঙ্ক্ষা আপনার সামনে উপস্থিত হতে পারে। তারপর সেগুলোকে এড়ানোর জন্য গঠনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে আপনি সমস্যাযুক্ত আকাঙ্ক্ষার কাছে হার না মানেন।

ধরুন আপনি ডায়েট করার চেষ্টা করছেন কিন্তু  রোজই অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে ফেলছেন। এখন কী করা যায়? শুরুটা করতে হবে আপনার ঘর দিয়ে। বাড়িতে কোনো অস্বাস্থ্যকর খাবার না রাখার মাধ্যমে আপনি সেগুলোর প্রলোভন এড়াতে পারবেন।

৫) নিজের অগ্রগতি মনিটর করুন

‘সাইকোলজি টুডে’ এর মতে, নিজের সাফল্য মনিটর করার মাধ্যমে, আপনি নিজের লক্ষ্যের উপর নিবদ্ধ থাকতে পারবেন। সেল্ফ মনিটরিং করার মাধ্যমে আমরা নিজেদের ক্রিয়াকলাপে কুশলী হয়ে উঠতে পারব৷ সেটা আমাদের নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ ও পাল্টাতে সাহায্য করবে।

সেল্ফ ফিডব্যাক হচ্ছে নিজেকে যাচাই করার একটা ভালো উপায়। নিজের লক্ষ্য অর্জনের পথে আপনি কতটা অগ্রসর হতে পেরেছেন তা পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে আপনি লক্ষ্যের উপর আরো মনোযোগ দিতে পারবেন।

সঠিকভাবে ডায়েটের ক্যালরি হিসেব করা ও কী পরিমাণে খাচ্ছেন তা ট্রাক করতে না পারলে আপনার ডায়েটের লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

আত্ম-পর্যবেক্ষণ আমাদের নিজেদের আচার-আচরণকে আরো ভালোভাবে বুজে উঠতে সাহায্য করে। এটা করতে পারলে অভ্যাস পাল্টানো অনেক সহজ হবে।

৬) অগ্রাধিকার সেট করুন

যখনই চাপ অথবা বিরক্তি অনুভব করবেন তখনই আপনার দিন, সপ্তাহ, মাসের জন্য টু-ডু লিস্ট বানিয়ে ফেলতে পারেন।

তাহলে দেখতে পাবেন যে আপনি নিজের সেরাটা দেওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজের লক্ষ্যের দিকে কতটা এগিয়ে যাচ্ছেন।

সেটা আপনাকে নিজের উপর আত্মবিশ্বাস এনে দিবে। কারণ হতাশার ও অসহায়ত্বের অনুভূতি আপনাকে কেবল বিশৃঙ্খলা, দুশ্চিন্তার দিকেই নিয়ে যাবে।

৭) নিজেকে ক্ষমা করুন

ব্যর্থতা জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কয়েক বার ব্যর্থ হওয়াতে খারাপ কিছু নেই। নিজেকে ক্ষমা করে এগিয়ে যাওয়া শিখুন। নিজের উপর রাগ করে ব্যর্থতার ব্যাপারে ভাবতে থাকলে শুধু শুধু সময়ের অপচয়ই করবেন।

আপনার সফলতার ৮০% নির্ভর করে আপনার দৃষ্টিভঙ্গির উপর। যদি ব্যর্থতাকে ঘুরে দাড়ানোর সুযোগ হিসেবে না দেখতে পারেন তাহলে সফলতা আপনাকে ছোঁয়া দিবে না। তাই আপনাকে নিজের উপর খুশি হওয়া শিখতে হবে।

আমাকে আমার সফলতা দ্বারা বিচার করো না; ব্যর্থতা থেকে কতবার আমি ঘুরে দাঁড়িয়েছে তা দিয়ে আমাকে বিচার করো।

– নেলসন ম্যান্ডেলা

৮) ইচ্ছাশক্তি

কথায় আছে ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। ইচ্ছাশক্তি হচ্ছে সেই প্রবলতা বা মানসিক বল যা একজন ব্যক্তি লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে কাজ করার সময় অন্য প্রলোভন এড়ানোর জন্য ব্যবহার করে থাকে।

ইচ্ছাশক্তি না থাকলে আত্মনিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি হবে না। আত্মনিয়ন্ত্রণ সিমীত সম্পদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে যা শারিরীক শক্তির মতো কাজ করে।

যখন মানুষ আত্মনিয়ন্ত্রণ অনুশীলন করে, তারা এই সম্পদকে নিজেদের মাঝে নিয়ে ফেলে।

ফলস্বরূপ, যখন মানুষ দুই বা ততোধিক লক্ষ্যের বদলে কেবল একটা লক্ষ্যের উপর মনোযোগ নিবদ্ধ করে, তখন আত্মনিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি কার্যকর হয়। তাই প্লেটো বলেছেন, “একটাই কাজ করো আর সেটা ভালোমতো করো।

৯) ভালো অভ্যেস গড়ে তোলা

যখন আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ অনুশীলন করা শুরু করি, স্বাস্থ্যকর ক্রিয়াকলাপ এবং সিদ্ধান্তকে প্রশ্রয় দেওয়া শুরু করি, তখন সেগুলো সময়ের সাথে অভ্যাসে পরিণত হয়।

আর যখন সেটা ঘটে, আমাদের আর সেসব কাজ করার জন্য খুব বেশি ইচ্ছাশক্তি ব্যয় করতে হয় না।

৬টা ভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, যাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ভালো তাদের আচার-আচরণও অনেক ভালো হয়ে থাকে। সোজা ভাষায়, আমাদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে সেখানে আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করতে হবে।

Md. Tota Miahhttps://totamiah.com
লেখক বর্তমানে রাজশাহীর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত আছেন। এছাড়া তিনি একজন গবেষক, ব্লগার, ফিটনেস, উচ্চতর পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রে কাজ করেন। মোঃ তোতা মিয়া দেশের যুবসমাজকে কর্ম উপযোগী করে তোলার সপ্ন দেখেন।

JUST ADDED

More From The Author!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!