ব্যক্তিগত উন্নয়নযে কোন কাজে মনোযোগ ধরে রাখার ৫টি উপায়

যে কোন কাজে মনোযোগ ধরে রাখার ৫টি উপায়

-

কিভাবে মনোযোগ ধরে রেখে কাজের প্রোডাক্টিভিটি বাড়াবেন?

মনোযোগী ও প্রোডাক্টিভ হওয়া থেকে কোন জিনিসটা আপনাকে আটকাচ্ছে সে ব্যাপারে কখনো ভেবে দেখেছেন কি?কোন জিনিসটা আপনার মনকে অন্য দিকে নিয়ে যায়? চলুন সেটা বের করা যাক।

হয়তো জীবনে কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য না থাকা বা লক্ষ্য ছাড়া জীবন পরিচালনা করার জন্য সেটা ঘটছে। মনের যেকোনো বাসনা পূরণের জন্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে সেটার উপর মনোযোগ দিতে হয়। প্রত্যেক দিন সবার সমানভাবে কাটবে না।

কোনো কোনো দিন এমন যাবে যেদিন আপনি সামান্যও কাজ করে উঠতে পারবেন না, বা আপনি যেমনটা প্রোডাক্টিভ হতে চেয়েছিলেন তেমনটা হতে পারবেন না। তাই বলে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না।

আরও পড়ুনঃ Covid-19 পরবর্তী সময়ে চাকরি খোঁজার ৯ টি পাওয়ারফুল কৌশল

যখন জীবনের বা ক্যারিয়ারের লক্ষ্য অর্জনের বিষয়টা আসবে তখন আপনাকে সেটা শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ করার কোনো না কোনো পদ্ধতি খুঁজে বের করতেই হবে।আপনার দেহের অন্যান্য মসলের মতো, মনোযোগ হচ্ছে একটা মানসিক মাসল৷ এটাকে যত কাজ করাবেন এটা তত বড় আর শক্তিশালী হবে।

নিচে ৫ টি টিপস উল্লেখ করা হলো যা আপনার মনোযোগ ও প্রোডাক্টিভিটিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

০১) মাল্টিটাস্কিং করা বন্ধ করুন

আমাদের মাঝে অনেকেই বিশ্বাস করে যে একসাথে একাধিক কাজ করলে কম সময়ে বেশি কাজ করা যায়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে এই ধারণাটা পুরোপুরি ভুল। আমাদের মস্তিষ্ক কি একসাথে একাধিক কাজের প্রতি মনোযোগ দিতে পারে? হয়তো না।

আমরা বইয়ের শার্লক হোমস না বা কমিক্সের টনি স্টার্ক না। হ্যাঁ, বাস্তব জীবনে অনেকে আছে যারা হয়তো এটা করতে পারে কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষ। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এক সাথে একাধিক কাজ করতে গেলে কোনো কাজের প্রতিই পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না।

কখনো কখনো মনে হতে পারে যে মাল্টিটাস্কিং আমাদের সময় বাঁচাতে সাহায্য করছে কিন্তু যখন দুটো কাজই অর্ধেক হয়ে থেকে যাবে তখন উল্টো বেশি সময় নষ্ট হবে। মাল্টিটাস্কিং এর ক্ষতিকর প্রভাবের ব্যাপারে বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা বেশ চিন্তিত হয়ে উঠেছেন।

নিউরোলজিস্ট ড্যানিয়েল জে. লেভেয়িন মানব মস্তিষ্কের উপর মাল্টিটাস্কিং এর ক্ষতিকর প্রভাবের বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে লম্বা সময় ধরে মাল্টিটাস্কিং করলে সেটা মস্তিষ্কে সেই ফাংশন গুলোর প্রতি এক ধরণের কেমিক্যাল অ্যাডিকশনের সাইকেল সৃষ্টি করে।

একসাথে মস্তিষ্কে জমা হওয়া বিভিন্ন টাস্কের ভেরিফিকেশন সম্পূর্ণ করার সিগনাল হিসেবে মস্তিষ্ক সেগুলোকে গ্রহণ করে। সেটা করতে গিয়ে, আমাদের মস্তিষ্ক এই সব কাজের প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। যেটা আমাদের ওভারঅল ফোকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

মাল্টিটাস্কিং এর ব্যাপারে সতর্ক না হলে ব্রেনের কার্যকারীতা কমতে শুরু করে, স্মৃতিশক্তি মারাত্মকভাবে হ্রাস পেতে পারে। তাই কাজের গতি বাড়াতে হলে মাল্টিটাস্কিং বাদ দিতে হবে। ব্রেনকে চাপ মুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে।

এখন আপনি অনেক মানুষকে দেখবেন যারা দাবী করে যে তারা খুব ভালো মাল্টিটাস্কিং করতে পারে। কিন্তু এমন কয়েকজনের উপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে যে তারা কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত নিম্নমানের কর্মী।

তাদের কাজের গুণগত মান অনেক খারাপ হয়ে থাকে। সে তুলনায় যারা শুধু নির্দিষ্ট একটা কাজের উপর পুরো মনোযোগ নিবদ্ধ করে তাদের কাজের মান অনেক ভালো হয়।

০২) পোমোডোরো টেকনিক ব্যবহার করুন

১৯৮০ সালে ফ্রান্সেসকো সিরিলো এই টেকনিক উদ্ভাবন করেন।

পোমোডোরো টেকনিক হচ্ছে একটি বিখ্যাত টাইম ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি যাতে একজন ব্যক্তি হাতে থাকা সময়ের বিরুদ্ধে কাজ না করে সেটা নিয়েই সব কাজ করে। নিজের মনোযোগ ও প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধিতে এই টেকনিক অনেক সাহায্য করে।

তবে, পোমোডোরো টেকনিক তখনই বেশি কাজে আসবে যখন আপনি কোনো নির্দিষ্ট প্রোজেক্টে কাজ করতে গিয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন  না বা জানতে চান যে কাজটা সম্পূর্ণ করতে কতো সময় লাগবে। যেসকল কাজ বার বার করা লাগে সেগুলোর ক্ষেত্রে এই টেকনিক বেশি কার্যকর।

অনেক সময় দেখবেন আপনি বই নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে আছেন কিন্তু পড়া আর হচ্ছে না। অন্য সব কাজ হচ্ছে কিন্তু পড়া না। শত চেষ্টা করেও বইয়ে মন দিতে পারছেন না। এরকম পরিস্থিতে পোমোডোরো টেকনিক বেশ কার্যকর।

এই পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হলে আপনাকে যা যা করতে হবে তা হলো:-

  • একটা নির্দিষ্ট কাজকে বেছে নিন।
  • আপনার মোট সময়কে ২৫ মিনিট করে ভাগ করুন এবং প্রত্যেক ভগ্নাংশের মাঝে ৫ মিনিটের বিরতি রাখুন।
  • এটাকে পুনরাবৃত্তি করুন।
  • ৪ পোমোডোরো পর, ১৫-২০ মিনিটের একটা লম্বা বিরতি নিন।
  • প্রত্যেকটা সেশনকে আপনার টু ডু লিস্টে বা নোটবুকে মার্ক করার মাধ্যমে ট্রাক করুন।

যখন টাইমার সেট করে কোনো কাজ শুরু করবেন তখন ২৫ মিনিট না হওয়া পর্যন্ত সে কাজ থেকে মনোযোগ সরানো যাবে না। তারপর একটা ৫ মিনিটের ব্রেক নিয়ে আবার শুরু করবেন। এভাবে পড়ালেখা করলে সেটা খুবই কার্যকরী হয়।

০৩) আপনার পিক আওয়ার খুঁজে বের করুন

যদি আপনি একই সাথে আপনার মনোযোগ ও প্রোডাক্টিভিটি বাড়াতে চান তাহলে আপনার পিক আওয়ারকে ঠিকভাবে ও বিজ্ঞতার সাথে ব্যবহার করুন। পিক আওয়ার হচ্ছে সে সময়টা যখন আপনি বেশি ফোকাশ করতে পারেন এবং দিনের অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি প্রোডাক্টিভ থাকেন।

সবার এরকম পিক আওয়ার থাকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে এরকম পিক আওয়ারে লক্ষ্যের উপর মন নিবদ্ধ করে বেশি কাজ করে যাওয়া। এই ২/৪ ঘন্টার সর্বোচ্চ ব্যবহার আপনাকে করতে হবে।

০৪) কোন জিনিসটা আপনার মনোযোগ নষ্ট করে তা জানুন

প্রযুক্তি বর্তমানে আমাদের জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কোনো নির্দিষ্ট একটা কাজ করার সময় আচমকা একটা ফোন কল এলে বা সোস্যাল মিডিয়াতে ম্যাসেজ এলে আমাদের মনোযোগ অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।

তখন আমরা কাজ থেকে মনোযোগ সরিয়ে সেদিকে নিয়ে যায়। জেনে হয়তো আশ্চর্য হবেন যে, এরকম ঘটলে মনোযোগ আবার ফিরিয়ে আনতে আমাদের মস্তিষ্কের ২৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ড সময় লাগে। ম্যাককিনসি গ্লোবাল ইন্সটিটিউটের করা অন্য এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, একজন ব্যক্তি ১৩ ঘন্টা বা সাপ্তাহিক কর্মদিবসের ২৮% সময় ই-মেইল ম্যানেজ করার পেছনে ব্যয় করে।

এর অর্থ হচ্ছে প্রযুক্তি আসক্ত লোকেরা অনেক মূল্যবান সময় প্রযুক্তি ব্যবহারের পিছে ব্যয় করে। তাই একটা নির্দিষ্ট কাজের উপর মনোযোগ নিবদ্ধ করার চেষ্টা করুন আর ফোকাশ ও প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধির জন্য একটা ভালো কাজের পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করুন।

০৫) মাইন্ডফুলনেস প্রাক্টিস করুন

আচ্ছা বলুন তো, আপনার সাথে কখনো কি এমন ঘটেছে যে আপনি ফোনটা হাতে নিয়েছেন কিন্তু মনে করতে পারছেন না কেন বা আপনি ক্লাসে বসে লেকচার শুনছেন কিন্তু শারিরীকভাবে ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও আপনার মন বাইরে কোথাও আছে বা আপনি আপনার মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, বরং আপনার মন বা আবেগ বা আপনার কোনো চিন্তা আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

যদি এরকমটা আপনার সাথে প্রায়ই ঘটে থাকে তাহলে আপনার মাইন্ডফুলনেস প্রাক্টিস করা উচিত।

জন কাবার্ট জিন, যাকে মাইন্ডফুলনেসর জনক বলা হয়, উনি একটি সংগা দিয়েছেন আমাদেরকে, “কোনো একটি উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো রকম বিচার বিবেচনা না করে বর্তমান মুহুর্তে সজাগ থাকাই হচ্ছে মাইন্ডফুলনেস।”

অর্থাৎ বর্তমানে যে কাজ করছেন সেটাতে পুরোপুরি উপস্থিত থাকা ও নিজের অনুভূতির ব্যাপারে পুরোপুরি অবগত থাকা এবং অন্য কিছু দ্বারা বিভ্রান্ত না হওয়া। আমরা সবাই মাইন্ডফুল থাকি, কোনো না কোনো কাজে। ভেবে দেখুন, এমন অনেক কাজ আছে যা করার সময় আপনার মনোযোগ কখনো নষ্ট হয় না আবার এমনও কাজ আছে যা করার সময় আপনি কোনো মতেই মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না।

এখন কোনো কাজ করতে গিয়ে কোন বিষয় গুলো আমাদের মনকে অন্য দিকে নিয়ে যায় আর কী করলে মনটা আবার ফেরত আসে, আমরা যদি সেই কৌশল আয়ত্ত করতে পারি তাহলে আমরা কাজ গুলোকে আরো মাইন্ডফুলি করতে পারব।

ভবিষ্যত বা অতীত নিয়ে চিন্তা না করে যদি বর্তমানকে আমাদের সম্পূর্ণ মনোযোগটা দিই তাহলে আমাদের ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারব। মাইন্ডফুলনেস হচ্ছে একটি দক্ষতা যা অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। চেষ্টা করলে সবাই এটা করতে পারবে।

আরও পড়ুনঃ করোনা পরবর্তী বিশ্বে চাকরীর বাজারে এগিয়ে থাকার সেরা ৮ টি স্কিল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

সাম্প্রতিক ব্লগ

৫ টি সেরা টাইম ম্যানেজমেন্ট টিপস

টাইম ম্যানেজমেন্ট কি এবং কেন শিখবেন? সহজ বাংলায় টাইম ম্যানেজমেন্টের অর্থ হচ্ছে "সময় ব্যবস্থাপনা"। আমাদের সময় সীমিত, তাই এটাকে...

সিভি ও রিজিউম এর মধ্যে পার্থক্য কী?

আপনি যখন জীবনের প্রথম চাকরির জন্য আবেদন করবেন তখন একটু হলেও ভয় নিশ্চয় পাবেন। চাকরি প্রার্থীদের মনে এই প্রশ্নটা...

করোনা পরবর্তী বিশ্বে চাকরীর বাজারে এগিয়ে থাকার সেরা ৮ টি স্কিল

মহামারী পরবর্তী সময়ে চাকরীর ভবিষ্যৎ লকডাউন সারা পৃথিবীর মানুষের উপর শারীরিক অথবা মানসিকভাবে প্রভাব ফেলছে। চাকুরীজীবী অথবা বেকার, প্রত্যেকেই...

আরও পড়ুন একই জাতীয়
সর্বাধিক পঠিত

0Shares