শিক্ষার্থীদের জন্য লিংকডইনের ১০ ব্যবহার

ফেসবুক আজ বিশ্বের বৃহত্তম সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইট যার ২.৮ বিলিয়ন ব্যবহারকারী আছে। কিন্তু লিংকডইন ও কম যায় না। বর্তমানে ৭৪০ মিলিয়ন মানুষ এই প্রফেশনাল নেটওয়ার্কিং সাইট তার ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময়ের জন্য সমর্থন করে আসছে।

এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণভাবে যারা নেটওয়ার্ক খুঁজছেন এবং ব্যবসায়িক সংযোগ গড়ে তুলছেন তাদের জন্য, লিঙ্কডইন ব্যবহারকারীরা প্ল্যাটফর্মটিকে “পেশাদার সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইট” হিসাবে ব্যপক ব্যবহিত।

২০২১ সালের লিঙ্কদিনের তথ্য মতে, ২০০ টি ও বেশি দেশের ব্যবহারকারিরা বিভিন্ন কারনে ব্যবহার করছে। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই টেক কোম্পানি সামাজিক ও প্রফেশনাল নেটওয়ার্কিং বৃদ্ধিতে আধিপত্য বিস্তার করছে। 

কেন শিক্ষার্থীরা লিংকডইন ব্যবহার করবে? 

লিংকডইন শুধু পেশাজীবীদের জন্য নয়, বরং শিক্ষার্থীদের জন্যও বেশ কাজের একটি পেশাদার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

এর মাধ্যমে একদিকে যেমন বর্তমান সময়ে বিভিন্ন পেশা খাতে কী চলছে সে সম্পর্কে জানা যায়, তেমনি ভবিষ্যতের কোন দক্ষতাগুলো সামনে কাজে আসতে পারে, কোন পেশায় কেমন সুযোগ, কোন পেশার দক্ষতা বিষয়ক পরীক্ষায় কী কী সনদ প্রয়োজন,কাজের ধরণ ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

শিক্ষার্থীরা কীভাবে লিংকডইন কাজে লাগাতে পারেন ও কি কি সুবিধা আছে যা ক্যারিয়ার তৈরিতে অনেক কাজে আসে। 

১. ইমেইল এ চাকরির নোটিফিকেশান পেতে

একবার লিঙ্কডইন-এ আপনার প্রোফাইল সেট-আপ করে নিলে, আপনি পছন্দের চাকরির বিজ্ঞপ্তি পেতে ই-মেইল সতর্কতা সেট করতে পারেন।

আপনার পছন্দগুলি সেট করুন এবং আপনি শুধুমাত্র আপনার আগ্রহের জন্য প্রাসঙ্গিক চাকরির সতর্কতা পাবেন। নতুন গ্র্যাজুয়েটদের জন্য, স্টুডেন্ট জবস পোর্টাল ছাড়াও লিঙ্কেদিনে এন্ট্রি লেভেলের চাকরি এবং ইন্টার্নশিপ পোস্ট পেতে পারেন।

আরও পড়ুনঃ প্রফেশনাল ইমেইল লেখার A to Z নিয়ম কানুন

২. কোম্পানি সম্পর্কে ধারণা পেতে-

লিংকডইন ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের এবং চাকরি প্রার্থীদের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলির মধ্যে একটি হল যে তারা তাদের লক্ষ্য অনুযায়ী  নিয়োগকারীদের পেজে যাবতীয় কার্যক্রম দেখে নিতে পারে।

লিঙ্কদিনে কোম্পানি পরিদর্শন করে, আপনি কোম্পানির অবস্থান, নিয়োগের প্রক্রিয়া এবং তাদের কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারেন। লিংকডইন -এ এই ধরনের কোম্পানিতে আপনার পদচারনা সবসময় আপনাকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে সাহায্য করে। 

৩. কোম্পানি যেন আপনাকে খুঁজে পায়-

আজকাল, যখন আপনি চাকরির জন্য আবেদন করবেন, আপনার সম্ভাব্য নিয়োগকর্তা ইন্টার্ভিউ বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই আপনার সম্পরকে ইন্টারনেট অনুসন্ধান করতে পারেন।

তাই একটি ছাত্র হিসাবে একটি লিঙ্কডইন অ্যাকাউন্ট থাকার মাধ্যমে, আপনি নিজের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন (এবং আরো পেশাদার!) দিক দেখাতে পারেন। একটি লিঙ্কডইন অ্যাকাউন্ট থাকা কোম্পানিগুলিকে আপনাকে সহজে খুঁজে পেতে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, আপনি যে তথ্যটি পেতে চান তা খুঁজে পেতে অনুমতি দেয়।

এ ছাড়া আপনার শিক্ষক এবং সহপাঠীদের কাছ থেকে সুপারিশ বা অনুমোদনের জন্য জিজ্ঞাসা করতে পারেন। আপনি সর্বদা তাদের বিস্তারিত গুণাবলী এবং দক্ষতা উল্লেখ করতে বলতে পারেন যা আপনার কর্মজীবনের লক্ষ্যকে সমর্থন করে। সর্বাধিক সংখ্যক সুপারিশপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিয়োগকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার একটি দুর্দান্ত সুযোগ রয়েছে। তাই এগিয়ে যান, আপনার কর্মসংস্থান বাড়ান।

৪. চাকরির খোঁজ পেতে-

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা লিংকডইনের মাধ্যমে চাক্রির সন্ধান পেতে পারেন। অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান এই ওয়েবসাইটেই চাকরির বিজ্ঞপ্তি এবং আবেদনপত্র গ্রহণ করে।

আরও পড়ুনঃ আগামীর চাকরির বাজারে যে দক্ষতা গুলো আধিপত্য বিস্তার করবে?

বিভিন্ন ইন্টার্নশিপ ও খণ্ডকালীন কাজের সুযোগের খবর লিংকডইনে দ্রুত পাওয়া যায়। লিংকডইন প্রোফাইল থেকে সরাসরি এসব কাজের জন্য আবেদন করা যায়।

এ ছাড়াও অনেক প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ কর্মকর্তা ও কর্মীদের কাছ থেকে নানা প্রকল্প ও টুকরো কাজের খোঁজ পাওয়া যায়। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের সহযোগী কিংবা অনুবাদক হিসেবে কাজের সুযোগের খবরও চোখে পড়ে নিয়মিত।

৫. দক্ষতা ও লার্নিং বাড়াতে-

লিংকডইনের মাধ্যমে বিভিন্ন পেশা সংশ্লিষ্ট দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা যেমন পাওয়া যায়, তেমনি তৈরি হয় শেখার সুযোগ। এ ক্ষেত্রে লিংকডইন লার্নিংসহ এ ধরনের ভিডিও পোস্টের মাধ্যমে জানার সুযোগ আছে।

বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও নির্বাহীরা নিজেদের পেশা সংশ্লিষ্ট ভাবনা লিংকডইনের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। তাঁদের ভাবনা ও লেখা সরাসরি শিক্ষার্থীরা পরামর্শ হিসেবে অনুসরণ করতে পারেন। মাইক্রোসফট এক্সেল, এসএপিসহ বিভিন্ন সফটওয়্যার কীভাবে পেশাজীবনে কাজে আসে, সে সংক্রান্ত পরামর্শও পাওয়া যায়।

৬. ভার্চ্যুয়াল মেন্টরশিপ পেতে-

ধরুন, আপনি আজ থেকে পাঁচ বছর পর মাইক্রোসফটের মতো কোনো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চান। এখন থেকেই কিন্তু লিংকডইনের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য জেনে প্রস্তুতি শুরু করে দিতে পারেন। মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সত্য নাদেলা লিংকডইনে বেশ সক্রিয়।

নিজের ভাবনা এবং পেশা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মতামত ও পরামর্শ তিনি লিংকডইনে শেয়ার করেন। একজন শিক্ষার্থীর জন্য এই প্রোফাইল খুব কাজের। এ ছাড়াও করপোরেট দুনিয়ায় আলোচিত যাঁরা; যেমন বিল গেটস, রিচার্ড ব্র্যানসন, সাইমন সিনেক, জ্যাক ওয়েলশসহ অনেকের নিবন্ধ পড়ার সুযোগ মেলে এখানে।

৭. প্রফেশনালদের সাথে নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ বাড়াতে-

কোন প্রতিষ্ঠানে কাজের পরিবেশ কেমন, কোথায় কর্মীদের কী কী দক্ষতা প্রয়োজন, তা জানার ক্ষেত্রে ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের জন্য লিংকডইন নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।

লিংকডইনের বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর মানবসম্পদ বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাজ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া ; যা পরবর্তীতে চাকরি খোঁজা বা ইন্টারভিউয়ের সময় কাজে লাগে।

লিঙ্কডইন আপনাকে বিশ্বজুড়ে পেশাদারদের সাথে সংযোগ এবং নেটওয়ার্ক করার সুযোগ দেয়। সেক্টর অনুসারে বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে যা আপনাকে কেবল নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রেই সাহায্য করবে না বরং আপনার দক্ষতা এবং আগ্রহের ক্ষেত্রের সাথে সম্পর্কিত অনেক তথ্য পেতে ও। এটি সংক্ষেপে বলতে পারি যে এটি একটি বিশাল তথ্য ভাণ্ডার যা আপনাকে সাহায্য করবে দীর্ঘমেয়াদে।

৮. করপোরেট কালচার জানতে-

করপোরেট দুনিয়ার কালচার বা পেশাদার আচরণ সম্পর্কে জানতে লিংকডইন কার্যকর একটি মাধ্যম। শুধু ইমেইল লেখা নয়, কীভাবে ভাইবা বোর্ডে নিজেকে উপস্থাপন করতে হয়, এ সময়ের করপোরেট ট্রেন্ড কী, এ ধরনের লেখা পড়ে নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগ থাকে।

৯. অন্যদের সাথে আপডেট শেয়ার করতে-

যখন আপনি আপনার লিঙ্কডইন প্রোফাইল বা অভিজ্ঞতা, অর্জন, কোন  আপডেট করেন, আপনার নেটওয়ার্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই পরিবর্তনগুলি সম্পর্কে অবহিত হয়।

আপনাকে প্রত্যেককে পৃথক ই-মেইল পাঠাতে হবে না। একটি চমৎকার পার্শ্ব সুবিধা হল এই স্বয়ংক্রিয় বিজ্ঞপ্তি আপনাকে তাদের মনোযোগ এবং সচেতনতার দিকে নিয়ে আসে। তারপরে, আপনি যখন তাদের যোগ্যতা অনুসারে চাকরির সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে পারবেন তখন আপনি তাদের মনে থাকবেন।

১০. বৈশ্বিক উপস্থিতি বাড়াতে-

লিঙ্কডইন একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম। আপনি যদি বিদেশে চাকরি পেতে আগ্রহী হন, তাহলে আপনি এই সোশ্যাল মিডিয়া ওয়েবসাইটে নেটওয়ার্কিং করে অনেক সুবিধা পেতে পারেন। আপনি সমস্ত আন্তর্জাতিক বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তাদের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারেন এবং বিদেশে চাকরি খুঁজে পেতে পারেন। 

পরিশেষে

বর্তমান যুগের শিক্ষার্থী হিসাবে একটি লিঙ্কডইন অ্যাকাউন্ট থাকা প্রমাণ করে যে আপনি আপনার কর্মজীবনের লক্ষ্য অনুসরণ করার জন্য আন্তরিক ভাবে নিবেদিত। সংক্ষেপে দেখে নিন, কিছু প্রয়োজনীয় টিপস যা লিঙ্কদিন প্রোফাইল তৈরি করতে সাহায্য করবে।

  • লিঙ্কডইন প্রোফাইলে পেশফাইল ছবি ব্যবহার করুন।
  • গ্রুপগুলিতে বা পেজগুলিতে যোগ দিন এবং যেসব কোম্পানিতে আপনার আগ্রহ আছে তা অনুসরণ করুন।
  • আপনার প্রোফাইল সম্পূর্ণ করতে ভুলবেন না! এটিকে একটি বর্ধিত সিভি হিসাবে ব্যবহার করুন এবং নিয়োগকর্তাদের কাছে প্রমাণ করার জন্য যতটা সম্ভব তথ্য অন্তর্ভুক্ত করুন যে আপনি কর্মক্ষেত্রে ভালো কাজে লাগাতে পারেন এমন অনেক দক্ষতার অধিকারী।
  • আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরে লিঙ্কডইন -এ যোগ দিন যাতে আপনি আপনার ৪ বছরের পড়াশোনা জুড়ে অগ্রগতি দেখাতে পারেন।

এ ছাড়া আপনার প্রোফাইল সম্পূর্ণ করার সাথে সাথে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করা শুরু করুন। শুধু আপনার অ্যাকাউন্টকে সুপ্ত অবস্থায় রেখে যাবেন না, এর সর্বোচ্চ ব্যবহার করুন এবং সেই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগগুলি তৈরি করা শুরু করুন। তাহলে নিজেকে অন্য সব চাকরি প্রার্থী থেকে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে পারবেন। 

Md. Tota Miahhttps://totamiah.com
লেখক বর্তমানে রাজশাহীর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত আছেন। এছাড়া তিনি একজন গবেষক, ব্লগার, ফিটনেস, উচ্চতর পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রে কাজ করেন। মোঃ তোতা মিয়া দেশের যুবসমাজকে কর্ম উপযোগী করে তোলার সপ্ন দেখেন।

JUST ADDED

More From The Author!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!